রবিবার, ২১ Jun ২০২৬, ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বললেও থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সংঘাত চলছেই ওমান উপসাগরে ট্যাঙ্কার জব্দ, ইরানে বাংলাদেশিসহ ১৮ ক্রুকে আটক মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১ বাদ দিয়ে কোনো চেতনা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল নয়: শামীম হায়দার ষড়যন্ত্র চলছে, নির্বাচন অতো সহজ হবে না : তারেক রহমান হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত, মালিক গ্রেফতার দেশের সব নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ সুদানে জাতিসংঘের ঘাঁটিতে হামলা, ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত জাপানে জোট সরকার গড়তে রাজি এলডিপি, ইশিন হামাস যুদ্ধ বিরতির লঙ্ঘন ঘটিয়েছে অভিযোগ করে গাজায় ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে লাখো মানুষের ঢল

যেমন আছেন শবনম

অশোক ঘোষ পরিচালিত ‘নাচের পুতুল’ চলচ্চিত্রে নায়ক রাজ রাজ্জাকের ঠোঁটে মাহমুদুন্নবীর গাওয়া ‘আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন’ কথার সেই অবিস্মরণীয় গানটির কথা নিশ্চয়ই কারও ভুলে যাওয়ার কথা নয়। এই একটি গানের জন্যই এই কালজয়ী সিনেমাটি অনেকে একাধিকবার দেখেছেন। সিনেমাটির এই গানটি এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, এই সিনেমাটির রিলিজের ২৫-৩০ বছর পরও পুরনো সিনেমা হিসেবে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হতে দেখা গেছে। শিল্পী মাহমুদুন্নবীর কণ্ঠের এই গানটি আজও দারুণ জনপ্রিয়।

কালজয়ী সিনেমাটির নায়িকা ছিলেন ষাটের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা শবনম। এ নামের অর্থ দাঁড়ায় ভোরের শিশির। নামেই মিশে আছে যেন কেমন ঘোর লাগা নেশা। তাই গানটির সঙ্গে তার অনুভূতি প্রকাশের অনবদ্য ভঙ্গি দর্শককে এতটাই ভালো লাগায় যে তখন দর্শক যেন মনে-মনে শয়নে-স্বপনের তাকেই কল্পনা করতেন। তখন ঢাকাই সিনেমায় রহমান-শবনম ও রাজ্জাক-শবনম জুটি দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই তারকার প্রকৃত নাম ঝর্ণা বসাক।

ঢাকাই সিনেমার এই দারুণ প্রিয়মুখের শবনম বাংলার পাশাপাশি উর্দু ও পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র দর্শকের নজরেও ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়মুখ। সেখানেও রয়েছে তার অনবদ্য অভিনয়ের ছাপ। তিনি যে কত ভালো অভিনয় জানতেন সেটা পরিণত বয়সে করা ‘আম্মাজান’ সিনেমাতেও দর্শক উপলব্ধি করতে পেরেছেন। ১৯৪২ সালে জন্মগ্রহণকারী একাধিক ভাষার এ নন্দিত অভিনেত্রী মাস কয়েক আগে ৮৪ বছরে পদার্পণ করেন।

দীর্ঘদিন ধরেই চলচ্চিত্রের সঙ্গে নেই এ অভিনেত্রী। কীভাবে কাটছে তার দিনগুলো? প্রবীণ এ অভিনেত্রীর বেশির ভাগ সময়ই কাটে এখন বাসায়। বলেন, ‘খুব বেশি প্রয়োজন না পড়লে আমি কোথাও যাই না। দেশের সিনেমায় কী হচ্ছে না হচ্ছে কিছুই জানি না। চুপচাপ থাকতে পছন্দ করি। তবে এটুকু বুঝি দেশের সিনেমা আরও বহুদূর যাওয়া দরকার ছিল। কিন্তু উন্নতি না হয়ে বরং অবনতি হয়েছে। দেখুন- কাউকে ফলো করে বড় হওয়া যায় না। আমরা বাঙালি, আমাদের নিজেদের ঐতিহ্য আছে। আমাদের সিনেমা হবে আমাদের মতো। অন্য কারও মতো নয়। কিন্তু আমরা করছি কি? বাইরের দেশে কোথায় কীভাবে সিনেমা হচ্ছে, বানাচ্ছে সেটাই ফলো করি।’

এক সময়ের প্রিয় ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যোগাযোগ হয় কিনা জানতে চাইলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে এই কিংবদন্তি অভিনেত্রী বলেন, ‘আমার সময়ের তেমন তো কেউ বেঁচে নেই। নাসিমা খান বেঁচে আছেন। তার সঙ্গে মাঝেমধ্যে ফোনে কথা হয়। এ ছাড়া আর কারও সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই।

অভিনেত্রী শবনম ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রিতে তার ক্যারিয়ার শুরু করলেও ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই লাহোরে চলে যান এবং সেখানেই স্থায়ী হন। বলা চলে, শবনমের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বর্ণালি সময়টাই গেছে লাহোরে। সেই অর্থে ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রি তার কাছ থেকে খুব বেশি কিছু পায়নি। আসলে এ অভিনেত্রী ছিলেন পুরোপুরি পেশাদার অভিনেত্রী। ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রিতে ১৯৭১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘নাচের পুতুল’ই ছিল তার নায়িকা হিসেবে অভিনয় করার শেষ সিনেমা।

এর আগে ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানের করাচিতে চলে যান তিনি। আশির দশকের শেষ পর্যন্ত ললিউডে প্রবল প্রতাপের সঙ্গে একচ্ছত্র প্রাধান্য বিস্তার করেছিলেন তিনি। সেখানকার দর্শকের কাছে এক মহানায়িকা শবনম। পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য পেয়েছেন সর্বোচ্চ ১২ বার নিগার অ্যাওয়ার্ড। আর তিনবার পাকিস্তানের জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। পাকিস্তানের নিগার অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তির দিক থেকেও শবনম গড়েছেন এক অবিস্মরণীয় কীর্তি।

১৯৬১ সালে মুস্তাফিজ পরিচালিত বাংলা চলচ্চিত্র ‘হারানো দিন’-এ বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন শবনম। ১৯৬২ সালে উর্দু চলচ্চিত্র ‘চান্দা’ ছবির মাধ্যমে তৎকালীন গোটা পাকিস্তান জুড়েই রাতারাতি তারকাখ্যাতি পেয়ে যান শবনম। পরের বছর ‘তালাশ’ সমগ্র পাকিস্তানে মুক্তি পেলে ওই সময়ের সর্বাপেক্ষা ব্যবসা সফল সিনেমার মর্যাদা লাভ করে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে শবনম পাকিস্তানের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে চিহ্নিত হন। বিশ্ব চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে দেখা যায় নায়িকা হিসেবে একজনের ক্যারিয়ার ১৫-২০ বছরের বেশি খুব একটা হয় না। সেদিক থেকে সম্ভবত বিশ্বে শবনমই সেই অভিনেত্রী যিনি ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ এর দশক পর্যন্ত তিনটি দশক ধারাবাহিক ও সফলভাবে রোমান্টিক চরিত্রে নজরকাড়া অভিনয় করে অগণিত দর্শক-শ্রোতার মন জয় করে নিয়েছিলেন। বাবা ননী বসাক ছিলেন একজন স্কাউট প্রশিক্ষক ও ফুটবল রেফারি। ১৯৬৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর স্বনামধন্য সঙ্গীত পরিচালক রবিন ঘোষকে বিয়ে করেন তিনি।

শবনম অভিনীত ঢাকাই সিনেমাগুলো- ‘আমার সংসার’, ‘এ দেশ তোমার আমার’, ‘কখনো আসেনি’, ‘জোয়ার ভাটা’, ‘নাচের পুতুল’, ‘রাজধানীর বুকে’, ‘সহধর্মিণী’, ‘আম্মাজান’ অন্যতম।

উর্দু সিনেমাগুলো- ‘আখেরি স্টেশন’, ‘আসরা’, ‘আয়না’, ‘আখো আখো মে’, ‘ইন্তিখাব’, ‘ক্যয়সে কাহু’, ‘কাভি আলভিদা না ক্যাহনা’, ‘চান্দা’, ‘চালো মান গায়ে’, ‘তালাশ’, ‘তুম মেরে’, ‘দোস্তী’, ‘দিল্লাগী’, ‘প্রীত না জানে রীত’, বেগানা’, ‘রিশতা’, ‘হাম দোনো’, ‘সাগর’ ও ‘সমন্দার’ প্রভৃতি।

শবনম এবং তার স্বামী সুরকার রবিন ঘোষ পাকিস্তানে কাটালেও দেশ মাতৃকার টানে দুজনেই আবার ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৮৮ সালে শবনম ঢাকায় এসে তার চরিত্র পরিবর্তন করে অভিনয় করতে থাকেন। তবে ঢাকায় আসার পর শবনম এবং রবিন ঘোষ দুজনেই চরম বিরূপ পরিস্থিতির শিকার হন। দুজনেই দক্ষিণ এশিয়ার প্রখ্যাত শিল্পী হওয়া সত্ত্বেও এফডিসিতে এক প্রকার অপাঙক্তেয় হয়ে পড়েন। এ সময় মাত্র কয়েকজন স্বনামধন্য পরিচালক তার পাশে দাঁড়ান। তার মধ্যে অন্যতম কাজী হায়াৎ। যিনি ১৯৯৯ সালে শবনমকে নিয়ে উপহার দিয়েছেন ঢাকাই সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় ও কালজয়ী সিনেমা ‘আম্মাজান’। এটাই শবনম অভিনীত সর্বশেষ সিনেমা। সিনেমাটিতে শবনমের অভিনয় দাগ কেটেছে কোটি দর্শকের মনে। তাকে দিয়েছে অসামান্য জনপ্রিয়তা। ৪০ বছরের অভিনয় জীবনে শবনব প্রায় দুশ’টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com